শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের সময় নিহত ২ জনের পরিচয় সনাক্ত চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বিয়ের মেহেদি অনুষ্ঠানের আলোকসজ্জার তারে জড়িয়ে স্ত্রীর মৃত্যু, স্বামী আহত পতনের বৃত্তে পুঁজিবাজার, দীর্ঘস্থায়ী দরপতনে ক্ষয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীর পুঁজি, ফিরছে না আস্থা চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন কালে আকস্মিক দুর্ঘটনায় ২ সেনা সদস্য নিহত ও ১ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা গুরুতর: আহত কর্মকর্তা গুরুতর: আহত কিশোরগঞ্জে হাসপাতালে অভিযান, দালাল চক্রের ১৭ সদস্য গ্রেফতার শ্রীপুরে নিখোঁজের ৮ ঘন্টা পর পুকুর থেকে ২ শিশুর লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ সংবাদ — মানবিক আবেদন 🚨 চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের করেরহাটে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় সাংবাদিকদের নিন্দা-প্রতিবাদ ও মানববন্ধন চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে ফ্রিজ বিস্ফোরণে ৪ বসতঘরে আগুন, পুড়ে গেছে ৩০ লক্ষাধিক টাকার জিনিসপত্র চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের কাস্টম কর্মকর্তা (সিলেটে কর্মরত:) ফেনীর লাল পোলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত।

পতনের বৃত্তে পুঁজিবাজার, দীর্ঘস্থায়ী দরপতনে ক্ষয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীর পুঁজি, ফিরছে না আস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় থাকা বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও বড় ধরনের পতনের চাপে পড়েছে। একের পর এক দরপতনে ক্ষয় হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মূলধন। লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন করে আস্থার সংকট। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তা এখনো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশিত আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
সর্বশেষ মঙ্গলবারের (৮ সেপ্টেম্বর) লেনদেনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক DSEX আরও ২৮ দশমিক ১০ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৩৯ দশমিক ৩২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। এদিন ৩৯৬টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৫২টির দর কমেছে, বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ৮৪টির। মোট লেনদেন হয়েছে ৫৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
এর মাত্র দুই দিন আগে, ৬ সেপ্টেম্বর, একদিনেই DSEX ১০৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ পড়ে যায়। ওইদিন ৩৪৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমার বিপরীতে বেড়েছিল মাত্র ২০টির। লেনদেনও কমে দাঁড়ায় ৫৪৫ কোটি টাকায়।
১৩ কার্যদিবসে সূচক হারায় ৩০৬ পয়েন্ট
পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতা যে সাময়িক নয়, তার প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৩টি কার্যদিবসে DSEX হারিয়েছে ৩০৬ পয়েন্ট বা প্রায় ৫ শতাংশ। একই সময়ে সূচক দুই মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের নিচে নেমে যায়।
তবে মাঝেমধ্যে বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও দেখা গেছে। ৭ সেপ্টেম্বর একপর্যায়ে DSEX ৬৭ পয়েন্ট পড়ে ৫ হাজার ৫০০-এর নিচে চলে গেলেও শেষ ঘণ্টায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কেনাকাটায় সূচক প্রায় ৯৫ পয়েন্ট ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫ হাজার ৫৬৭ পয়েন্টে দিন শেষ করে। সেদিন লেনদেন হয় ৫৭১ কোটি টাকা।
কিন্তু পরদিনই আবার বড় দরপতন হওয়ায় সেই ঘুরে দাঁড়ানোকে স্থায়ী পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ কমে গেছে।

কেন এমন পতন?
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পতনের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দুর্বল বিনিয়োগ আস্থা, তারল্য সংকট, কোম্পানির দুর্বল মৌলভিত্তি এবং নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ—সব মিলিয়েই বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
৬ সেপ্টেম্বরের বড় পতনের পর বাজারসংশ্লিষ্টরা বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর বড় চাপ হিসেবে উল্লেখ করেন। ওই একদিনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমে যায় প্রায় ৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা।

লেনদেন কমছে, বাড়ছে আতঙ্ক
একটি কার্যকর পুঁজিবাজারের অন্যতম প্রধান সূচক হলো লেনদেনের গভীরতা। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে সেই জায়গাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট।
২৭ আগস্ট ডিএসইতে লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে ৪৬৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। লেনদেন কমে যাওয়ার অর্থ হলো নতুন অর্থের প্রবাহ দুর্বল হচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ঝুঁকি নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে সামান্য বিক্রির চাপেও শেয়ারদরে বড় ধরনের পতন হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীর প্রশ্ন—কার কাছে যাবেন?
বাজারের দীর্ঘ পতনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। অনেক বিনিয়োগকারী উচ্চ দামে শেয়ার কিনে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে আটকে আছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কম দামে শেয়ার বিক্রি করছেন, আবার অনেকে লোকসান মেনে নিতে না পেরে বাজার থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু বিনিয়োগকারীর অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, পুঁজিবাজারের প্রতি নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে যেতে পারে।
সরকারের পদক্ষেপ কোথায়?
বাজার স্থিতিশীল করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীদের বড় প্রশ্ন—এসব পদক্ষেপের বাস্তব সুফল কোথায়?
বাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু নতুন নিয়ম বা নির্দেশনা জারি করলেই হবে না। কারসাজি, অস্বাভাবিক লেনদেন, দুর্বল কোম্পানির অনিয়ম এবং বিনিয়োগকারীর স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ, একজন বিনিয়োগকারী যখন দেখবেন অনিয়মের জন্য দ্রুত ও কার্যকর শাস্তি হচ্ছে, তখনই তাঁর মধ্যে বাজারের প্রতি আস্থা ফিরতে শুরু করবে।
দরকার ভালো কোম্পানি, দরকার নতুন বিনিয়োগ
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে বাজারে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।
সূচক ধরে রাখাই কি সমাধান?
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কৃত্রিমভাবে সূচক ধরে রাখা নয়, বরং বাজারের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করা।
সূচক সাময়িকভাবে বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি বাজারব্যবস্থা যেখানে ভালো কোম্পানির মূল্যায়ন হবে, স্বচ্ছতা থাকবে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী নিরাপদ বোধ করবেন।
৮ সেপ্টেম্বরের লেনদেন শেষে DSEX ৫ হাজার ৫৩৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ফলে ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের আশপাশের অঞ্চল এখন বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পরিণত হয়েছে। তবে এখান থেকে সূচক ঘুরে দাঁড়ালেই নতুন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি।
বরং আগামী কয়েকটি কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ, বাজারের breadth এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের দিকে নজর রাখাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন একটি সন্ধিক্ষণে। একদিকে দীর্ঘ পতনে বিনিয়োগকারীর পুঁজি ক্ষয় হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ ও আস্থা—দুটিই দুর্বল। ফলে এখন প্রয়োজন সাময়িক কোনো উদ্যোগ নয়; প্রয়োজন সমন্বিত, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
কারণ শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ সূচক নয়—বিনিয়োগকারীর আস্থা। আর সেই আস্থা হারিয়ে গেলে শুধু সূচক বাড়িয়ে বাজারকে টেকসইভাবে বাঁচানো সম্ভব নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page